বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ll Rainwater Harvesting

♦বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting)
**************************************

জল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এর সরবরাহ প্রকৃতির দানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক জলের জোগান নির্দিষ্ট। বৃষ্টির জলকে সংরক্ষিত রেখে পরে কার্যকর ভাবে তাকে যখন পুনর্ব্যবহার করা হয়, সেই প্রক্রিয়াকে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) বলে। এর সাহায্যে গ্রীষ্মকালীন বা শুষ্ক ঋতুতে জলের সমস্যা লাঘব হয়। বৃষ্টির জল হল পরিবেশ-বান্ধব। পরিবেশ সংরক্ষণ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় প্রকৃতির জলভান্ডার সমৃদ্ধ রাখা প্রয়োজন। শুধু প্রকল্প গ্রহণই নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধিরও প্রয়োজন রয়েছে।

পৃথিবীর মোট ভূপৃষ্ঠীয় ক্ষেত্রফলের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি জলভাগের অন্তর্গত। কিন্তু পৃথিবীর এই বিপুল জলরাশির ৯৭.৫% লবণাক্ত জল (Salt Water) এবং মাত্র ২.৫% সুপেয় জল বা মিষ্টি জল (Fresh Water)। আবার এই ২.৫% সুপেয় জলের ২% ই মেরু ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ রূপে জমাটবদ্ধ অবস্থায় সঞ্চিত রয়েছে এবং মাত্র ০.৫% ই আমরা ব্যবহার্য পরিমন্ডলে পেয়ে থাকি। সুতরাং একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ভৌমজল সঞ্চয় ও সংরক্ষণে এবং জলাভাব দূরীকরণে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ কতখানি প্রয়োজনীয়।

বিশ্ব জলসম্পদের বন্টন

 

 

জল সংরক্ষণের সুবিধাঃ-

(১) জল সরবরাহের খরচ হ্রাস।
(২) বন্যা প্রতিরোধে সাহায্য।
(৩) মৃত্তিকার উপরিস্তরের ক্ষয় হ্রাস।
(৪) শুষ্ক ঋতুতে বা অসময়ে জলের জোগান।
(৫) উদ্ভিদ ও কৃষিকাজের উন্নতি।
(৬) খরা দূরীকরণে সহায়তা।

বৃষ্টির জল সংরক্ষণের দুটি পদ্ধতি হল — (১) বাড়ির ছাদে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (২) ভূপৃষ্ঠস্থ জলধারার জল সংরক্ষণ। শহরাঞ্চলে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের প্রধান পদ্ধতিগুলি হল — রিচার্জ পিট, রিচার্জ ট্রাঙ্ক, টিউবওয়েল ও রিচার্জওয়েল, ছাদে জল সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রভৃতি। গ্রামাঞ্চলে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের প্রধান পদ্ধতিগুলি হল — গালি প্লাগ, চেকড্যাম, কূপ খনন, ছোটো ডোবা ও পুকুর খনন, ছাদে জল সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রভৃতি।

ছাদে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতিঃ-

যেসব অঞ্চলে (বিশেষত শহরাঞ্চলে) মৃত্তিকায় জলধারন ক্ষমতা নেই বা খুবই কম, সেইসব অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে ছাদে বৃষ্টির জল ধরে রেখে তা ভূপৃষ্ঠস্থ জলাধারে প্রেরণ করে ভৌমজলের সঞ্চয়বৃদ্ধি করা সম্ভব। শহরাঞ্চলে এভাবে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করলে রাস্তাঘাটে জল জমার সমস্যা লাঘব হবে এবং কিছুটা হলেও জলের সমস্যা দূর হবে। পরে গৃহস্থালির প্রয়োজনে এবং এই সংরক্ষিত জলকে পরিশুদ্ধ করে জলকে পানীয়জল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ

ভূপৃষ্ঠে জলধারার জল সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতিঃ-

বৃষ্টির জল যখন ভূমিভাগের মৃত্তিকাকে সম্পৃক্ত করে ফেলে, তখন অতিরিক্ত জলধারা ভূপৃষ্ঠস্থ জলধারা (Surface Runoff) রূপে নিকাশিত হয়। এই অতিরিক্ত জল একসাথে সংগ্রহ করে নির্মিত ভূপৃষ্ঠস্থ জলাধারে প্রেরণ করে সংগ্রহ করা যায়। ভৌমজলের পুনঃপ্রাপ্তিতেও এই জল ব্যবহার করা যায়। এভাবে জল সংরক্ষণ ভৌমজল উত্তোলনের প্রয়োজনীয়তাকে অনেকাংশে হ্রাস করে এবং কৃষক ও গৃহস্থের হাতের কাছেই সংরক্ষিত জল থাকায় ভবিষ্যতে জলসেচ বা পানীয়জলের প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যায়।

চেকড্যাম পদ্ধতিঃ-

ছোটো নালা বা জলধারার প্রবাহপথে নির্মিত ছোটো আকারের (কখনো কখনো অস্থায়ী) বাঁধকে চেকড্যাম বলে। এটি মূলত জলপ্রবাহের গতি হ্রাস করে মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করতে এবং জল সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচসহ বিবিধ কাজে ব্যবহৃত হয়। এই সুপ্রাচীন পদ্ধতি শুষ্ক অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠস্থ জলধারার জল সংরক্ষণে এবং আর্দ্র অঞ্চলে অতিরিক্ত জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা যায়।

চেক ড্যাম

গ্রামাঞ্চলে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিঃ-

গালি প্লাগঃ- মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি খুবই কার্যকর। বর্ষার সময় পাহাড়ী এলাকায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা জলধারা, ছোটো নদীর বাঁক যেখানে রয়েছে সেখানে এটি তৈরি করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বাঁধের পিছনে স্থায়ীভাবে অনেকটাই জল ধরে রাখা সম্ভব। যেখানে ভূমির ঢাল মাঝারি ও ধাপ কাটা নেই এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম সেখানে গালি প্লাগ একটি কার্যকর পদ্ধতি।


রিচার্জ শ্যাফটঃ- গ্রামের পুকুরের ক্ষেত্রে যেখানে অগভীর মৃত্তিকার স্তর জলকে জলাধারে পৌঁছানোর ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করে, সেখানে এধরনের পদ্ধতি খুবই উপযুক্ত।পুকুরে যদি রিচার্জ শ্যাফট বসিয়ে অতিরিক্ত জলকে মৃত্তিকার নীচে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে ভৌমজলের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া পরিমিত জল ব্যবহার করে বিবিধ কাজ করা যাবে।

শ্যাফট পদ্ধতি

ছাদে জল সংরক্ষণঃ- গ্রামাঞ্চলেও বৃষ্টির জলকে পাকাবাড়ির ছাদে ধরে তা ভূপৃষ্ঠস্থ জলাধারে সংরক্ষিত করে ভৌমজলস্তর বৃদ্ধি করা যায়। শুষ্ক গ্রামাঞ্চলে এটি কার্যকর পদ্ধতি। সঞ্চিত জল গৃহস্থালির কাজে এবং পরিশুদ্ধ করে পানীয়জল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

কৃষিক্ষেত্রে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিঃ-
কৃষিক্ষেত্রে ছোটো পুকুর ও জলাশয় তৈরি করে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে তা পুনরায় কৃষিকাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। খরা কবলিত বা কম বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে (যেমন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলা) এই পদ্ধতি উপযোগী। এই পদ্ধতিতে ছোটো জলাশয়গুলিতে জল ধরে রেখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত সেচের মাধ্যমে কৃষিকাজ করা সম্ভব। পাশাপাশি ভৌমজলস্তর বৃদ্ধি পাবে। অধিক রবিশস্য উৎপাদনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। এছাড়া ওই জলাশয়গুলিতে মাছচাষ করেও আর্থিক লাভবান হওয়া সম্ভব।

Global Rainwater Harvesting Market Revenue অনুসারে পৃথিবীতে এশিয়া – প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল প্রথম, ইউরোপ দ্বিতীয়, উত্তর আমেরিকা তৃতীয়, দক্ষিন আমেরিকা চতুর্থ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা পঞ্চম স্থানে রয়েছে। (Transparency Market Research ২০১৭)। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ অনুসারে ভারতের তিনটি অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ — (১) উত্তর পশ্চিম অঞ্চলঃ- পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ (২) পশ্চিম অঞ্চলঃ- রাজস্থান ও গুজরাট (৩) উপদ্বীপীয় অঞ্চলঃ- কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও তামিলনাড়ু।
ভারতের রাজস্থানের মরুস্থলী অঞ্চল, তামিরনাড়ু, কর্ণাটক প্রভৃতি রাজ্যে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের মাধ্যমে জলসংকট অনেকাংশে দূর করা গেছে। রাজস্থানের যোধপুর, পালি, বারমের জেলায় ২০০ টি গ্রামে এই পদ্ধতিতে ৩ লক্ষ মানুষের জল সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। জল সংরক্ষণ ব্যবস্থার ফলে ভারতের অন্যতম তাপযুক্ত অঞ্চলে জল ধরে রাখার পরিমাণ ২০ লক্ষ ঘনমিটার বাড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং জলসংকটের সমাধান হয়েছে। ভারতের রিচার্জের তুলনায় অধিক জল ব্যবহার করার তালিকায় প্রথম তিনটি রাজ্য হল — পাঞ্জাব, রাজস্থান, দিল্লি।
জলের উৎস গুলিকে সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃষ্টির জল ধরে রেখে কৃষিক্ষেত্রে সেচের কাজে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে ২০১১-১২ সাল থেকে পশিমবঙ্গ সরকার “জল ধরো জল ভরো” প্রকল্পটি শুরু করেছে এবং শুষ্ক অঞ্চলে এই প্রকল্পটি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।

বৃষ্টির জল সংরক্ষণ পদ্ধতিতে সাবধানতাঃ- বৃষ্টির জল সংরক্ষণ পদ্ধতিতে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার —
(১) ভূপৃষ্ঠস্থ জলাধারে অতিরিক্ত জল জমা হলে তা সংযোগকারী নালার মাধ্যমে অন্য একটি জলাধারে সঞ্চয় করা দরকার।
(২) জল পরিশুদ্ধ করার সময় নজর রাখতে হবে জল অপরিষ্কার যেন না থাকে বা ময়লা বা বর্জ্য পদার্থ যেন না মেশে।
**************************************
লেখিকাঃ- সোনালী ধাড়া (ডানকুনি, হুগলী)



 

নিম্নপ্রদত্ত লিঙ্ক থেকে বিভিন্ন বিষয়গুলি জেনে নিন 

ব্রিটিশ ভারতের প্রথম দশ জন ভাইসরয়

জীবন বিজ্ঞান স্পেশাল প্রথম পর্ব

বিভিন্ন প্রকার অর্থনৈতিক কার্যাবলী

পদার্থ বিজ্ঞানের সংকলন, দ্বিতীয় পর্ব

পরিবেশ বিদ্যার প্রশ্নোত্তর

ভারতীয় সংবিধান, দ্বিতীয় পর্ব

জীবন বিজ্ঞান স্পেশাল, প্রথম পর্ব

সাধারণ জ্ঞানের সংকলন, দ্বিতীয় পর্ব

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!